হাসপাতালের বেডে শুয়ে আছেন তিনি। মাথায় নানা চিন্তা। ভাবনার বেড়াজালে প্রায়ই প্যাঁচ লাগছে। খুলে যাচ্ছে জট। কখনও চোখ বন্ধ করে, আবার কখনও খুলে ভাবতে থাকেন তিনি। অপলক চোখে কখনও কখনও হাসপাতালের ছাদের দিকে তাকিয়ে ভাবতে থাকেন নানা কিছু। চিন্তার অনুরণনে শুধুই অথৈ জলের ঢেউ! অসুস্থ শরীর নিয়ে মানুষের জন্য তাঁর কী-ইবা করার আছে? ভেবেছেন নিজের জীবন নিয়েও। ভালোভাবে পর্যবেক্ষণও করেছেন তাঁর মতো আরও অসংখ্য মানুষের জীবন-যন্ত্রণাবোধ। খুব কাছ থেকেই দেখেছেন সর্বনাশা ক্যান্সার কীভাবে মানুষের জীবনকে মৃত্যুর দিকে ঠেলে দেয়। মৃত্যু সম্পর্কে হয়তো তাঁর এতটা গভীর উপলব্ধি হতো না, যদি নিজে ক্যান্সারে আক্রান্ত না হতেন। ভাবতে ভাবতে সিদ্ধান্তটা নিয়েই নেন। বেঁচে থাকলে ক্যান্সার আক্রান্ত এবং ক্যান্সার গবেষণার জন্য কাজ করবেন তিনি। তাঁর সেই ইচ্ছা পূরণ করতে মৃত্যুর আগে একপায়ে একটানা দৌড়েছিলেন ১৪২ দিন! পাড়ি দিয়েছিলেন দীর্ঘ ৫ হাজার ৩৭৩ কিলোমিটার, ইতিহাসের পাতায় যা আজ 'ম্যারাথন অব হোপ' নামে পরিচিত। উদ্দেশ্য ছিল ক্যান্সার হাসপাতালের জন্য অর্থ সংগ্রহ করা। তাঁর নাম টেরি ফক্স। সারা বিশ্বের মানুষ তাঁকে আজ একনামে চেনে।
টেরি ফক্সের জন্ম ১৯৫৮ সালের ২৮ জুলাই কানাডার মানিটোবায়। শৈশব কাটে ব্রিটিশ কলম্বিয়ার পোর্ট কোকুইটলামের মেরিল স্ট্রিটে। ছেলেবেলা থেকেই তিনি ছিলেন প্রচণ্ড খেলাপাগল। তাঁর প্রিয় ছিল গাড়ি চালানো। এ ছাড়া তিনি ভালোবাসতেন সসার, রাগবি, বেসবল এবং বাস্কেটবল।
১৯৭৬ সালের ১২ নভেম্বর। টেরি গাড়ি চালিয়ে বাসায় ফিরছিলেন। হঠাৎ গাড়িটি দুর্ঘটনায় পতিত হয়। তিনি তাতে আহত হন। ডান পায়ের হাঁটুতে বেশ জখম হয়। দৌড়ান হাসপাতালে। ভালো চিকিৎসাও হয়। কিন্তু টেরি বা চিকিৎসক কেউই ভাবতে পারেননি এ জখমই কেড়ে নেবে মূল্যবান একটি জীবন! ১৯৭৭ সালে হঠাৎ সেই জখমের স্থানে ব্যথা অনুভব করেন টেরি ফক্স। পরীক্ষা করে দেখা যায়, ওটা হাড়ের ক্যান্সারে রূপ নিয়েছে। এ অবস্থায় হাঁটুর কয়েক ইঞ্চি ওপরে কেটে ফেলা ছাড়া অন্য কোনো উপায় নেই। টেরি করলেনও তাই। এক পা ফেলেই দিলেন। তিন বছর চললেন এক পা ছাড়াই। কিন্তু আর কতদিন? বয়স তখন সবে ১৮। টেরি সিদ্ধান্ত নিলেন, যে মারাত্মক রোগের কারণে তিনি মৃত্যু পথযাত্রী, সেই রোগ যেন আর কারো জীবন কেড়ে নিতে না পারে, তার জন্য কিছু একটা করবেন। সে লক্ষ্যে সিদ্ধান্ত নেন ক্যান্সার গবেষণার জন্য অর্থ সংগ্রহ করতে এক পা নিয়েই তিনি দৌড়াবেন পুরো কানাডা।
১৯৮০ সালের ১২ এপ্রিল নিউফাউন্ডল্যান্ড থেকে শুরু করেন দৌড়। কিন্তু সর্বনাশা ক্যান্সার তাঁর ইচ্ছা পূরণে মোটেও পাত্তা দিল না। ওই বছরের ১ সেপ্টেম্বর থান্ডার বে'র কাছে দৌড় থামাতে বাধ্য হন। ভর্তি হন হাসপাতালে। কিছুদিন পরই তিনি মৃত্যুবরণ করেন, তখন তাঁর বয়স মাত্র ২২ বছর। ২০০৪ সালে কানাডিয়ানরা টেরি ফক্সকে ‘সেকেন্ড গ্রেটেস্ট কানাডিয়ান অফ অল টাইম’ হিসেবে নির্বাচিত করে। বিশ শতকে কানাডার সবচেয়ে জনপ্রিয় ব্যক্তিদের মধ্যে তিনি দ্বিতীয়। তাঁর স্মরণে পৃথিবীর বিভিন্ন দেশে আজ অনুষ্ঠিত হচ্ছে "টেরি ফক্স রান"। চলে ক্যান্সার গবেষণার জন্য অর্থ সংগ্রহ।
টেরি ফক্স আমাদের সবার জন্য এক জ্বলন্ত উদাহরণ। কর্মের মধ্য দিয়ে তিনি প্রমাণ করেছেন, শারীরিক অক্ষমতা কোনো কাজে প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি করতে পারে না। এর জন্য থাকা চাই অদম্য মনোবল।
আজ আমাদের এলাকায় দেখলাম পোষ্টার টাঙ্গানো হয়েছে, বিষয়বস্তু "দিনাজপুর ম্যারাথন"। কান্তজী মন্দির থেকে গোরা শহীদ ময়দান, আগামী ১৯ জানুয়ারী -তে। দৌড়-এ আমার প্রচন্ড অনীহা তবুও মনটা খুব করে চাইছে এই ম্যারাথনে অংশ নি, শুধুমাত্র তাঁর জন্য । Terri Fox, you are my hero...
18 December 2012
• ওয়েবসাইট থেকে...

কোন মন্তব্য নেই:
একটি মন্তব্য পোস্ট করুন