Powered By Blogger

বৃহস্পতিবার, ২০ জুন, ২০১৩

নিজের জন্মদিনে রাজীব ভাইয়ের পোস্ট...

চোখ বন্ধ করলেই আমি ছেলেটাকে দেখতে পাই। রোগা-পলকা শরীর। তালপাতার সেপাই। লিকলিকে লম্বা। যেন একটু দমকা বাতাসেই উড়ে যাবে। ভাঙা গাল। কোটরাগত চোখ। বাড়ন্ত বয়সটায় প্রয়োজনীয় বাড়তি পুষ্টি না পাওয়ার এক জীবন্ত মানচিত্র। নাকের নিচে উঁকি দিতে শুরু করেছে বেয়াড়া গোঁফ। এ নিয়ে ছেলেটা লজ্জায় আড়ষ্ট । বয়সটা শুধু শরীরের দিক দিয়েই তো আর বাড়ন্ত নয়; মনে, মানে-অভিমানেও। অকারণে আড়ালে কাঁদার।
ছেলেটা খুব লজ্জা লজ্জা ভাব নিয়ে দাঁড়িয়ে আছে। যেন ভয়ংকর কোনো অপরাধ করে ফেলেছে। মনে মনে প্রার্থনা করে যাচ্ছে, পরিচিত কেউ যেন তাকে এভাবে আবিষ্কার না করে। সমস্যা হলো, দিনটা আবার শুক্রবার। এদিন রংপুরের পৌরবাজারে অনেকেই বাজার করতে আসে। বাবার হাত ধরে আসে ছেলেরা। এই ছেলেটাও যেমন এসেছে। বাবার সঙ্গেই। কিন্তু এতে লজ্জার কী আছে?
আছে। কারণ ছেলেটা পৌরবাজারে কিছু কিনতে আসেনি। এসেছে বিক্রি করতে। পৌরবাজারের চলটা উঠে যাওয়া,পলেস্তারা খসে পড়া, এককালের সবুজ রঙের কিছু সাক্ষী-সবুদ বুকে ধারণ করে দাঁড়িয়ে থাকা মেইন গেটের পাশেই দাঁড়িয়ে আছে ছেলেটি। সামনে একটা আধখোলা বস্তায় ভুট্টা রাখা। ক্লাস এইটের পড়াশোনাকে সাময়িক বিরতি দিয়ে শহুরে ছেলেটা গ্রামে গিয়ে থেকেছিল ছয় মাস। এই সময়ের অনভ্যস্ত চাষাবাদের সাক্ষী এই ভুট্টা। ছেলেটা সেটাই বেচতে এসেছে। ছেলেটার পরিচয় এখন ভুট্টা বিক্রেতার। মধ্যবিত্তের সামাজিক বিন্যাস ছেলেটা ততদিনে বুঝে গেছে বলেই জানে, এই পরিচয়টায় বেশ লজ্জার ব্যাপার আছে। কেউ এই অবস্থায়, বিশেষ করে তার ক্লাসের বন্ধুরা দেখে ফেললে সর্বনাশ হয়ে যাবে। বন্ধুরা তো আর বুঝবে না, কোন অবস্থায় পড়ে আজ তাকে ভুট্টা বেচতে হচ্ছে। এ নিয়ে হাসাহাসি হবে খুব। ছেলেটাকে আবার আড়ালে গিয়ে কাঁদতে হবে। বয়সটা গুমোট কান্নার, দলা পাকিয়ে ওঠা অভিমানের।

যখন খুব হতাশ হয়ে পড়ি, এই ছেলেটার কথা ভাবি। হুট করে মধ্যবিত্ত থেকে গরিব, প্রায় নিঃস্ব হয়ে যাওয়া একটা পরিবারে বেড়ে ওঠা সেই ছেলেটা একের পর এক বিস্ময়ের জন্ম দিয়েছে। প্রাইভেট পড়ার বিলাসিতা ছিল না বলে সায়েন্স বাদ দিয়ে মানবিক বিভাগ বেছে নেওয়া। বন্ধুদের ফিজিক্সের সূত্র মুখস্ত করতে দেখার দীর্ঘশ্বাস বুকে চেপে রেখে সেই ছেলে এসএসসিতে বেশ ভালো করল। এইচএসসিতেও। এর পর ভর্তি হলো ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের লোক প্রশাসন বিভাগে। কিন্তু ছেলেটা যে কৃষক। নিজ হাতে সে বীজ বুনেছে, ছুঁয়ে দেখেছে কচি শস্য পাতার বুকে জমা শিশির। সেই হাতেই সে বীজ বুনেছে শব্দের। রোপিত সেই শব্দের বীজকে কখনো গল্পের ফসল হতে দেখেছে, কখনো কবিতা কিংবা নেহাতই অর্থহীন কিছু পঙ্‌ক্তির। লেখালেখিটা ছেলেটার এতই ভালো লাগত, হুট করে একদিন সে হয়ে গেল সাংবাদিক। বিস্ময়ের ব্যাপার হলো, সেই ছেলেটা, সেই ভুট্টা বিক্রেতা লাজুক ছেলেটাই মাত্র ২৬ বছর বয়সে দেশের শীর্ষ দৈনিকের জ্যেষ্ঠ সহ-সম্পাদকও হয়ে গেল একদিন। এত কম বয়সে, এত প্রতিকূলতার স্রোত ডিঙিয়ে শীর্ষ দৈনিকের এত গুরুত্বপূর্ণ পদে উঠে আসা---এ তো রূপকথা! এ তো গর্বের। কিন্তু এ এমন এক গল্প, যেটা লিখতে গিয়ে কেন জানি বারবার ঝাপসা হয়ে আসছে আমার চোখ। পলকা বাতাসেই উড়ে যাওয়া শরীর নিয়েও প্রচণ্ড ঝড়ে অবিচল থেকে করে যাওয়া ছেলেটার এই লড়াই যে আমি একদম কাছে থেকে দেখেছি।

ছেলেটার আজ জন্মদিন। আমাকে নিরন্তর অনুপ্রেরণা জুগিয়ে চলা সেই ভুট্টা বিক্রেতা ছেলেটাকে জন্ম দিনের শুভেচ্ছা। শুভ জন্মদিন রাজীব হাসান!
                                       

কোন মন্তব্য নেই:

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন